সংস্কৃতির কথা প্রবন্ধের মূল বক্তব্য, বিষয়বস্তু, মূলভাব

আজকে আমাদের বিষয় হল সংস্কৃতির কথা প্রবন্ধের মূল বক্তব্য নিয়ে আজ আমরা আলচনা করবো সংস্কৃতির কথা প্রবন্ধের বিষয়বস্তু, মূলভাব নিয়ে তাহলে চলুন শুরু করা যাক।

এ নিবন্ধে তিনি সংস্কৃতি বা কালচারের স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য নির্দেশ কর তে গিয়ে ধর্মের সাথে সংস্কৃতির যে পার্থক্য তা নিরূপণ করেছেন। তার মতে ধর্ম সাধারণ লােকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত ও মার্জিত লোকের ধর্ম। কালচার ও ধর্মকে এক করে ফেলার কোন উপায় নেই। ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি ইংরেজি ‘Culture’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ। সংস্কৃতি বা কালচারের সংজ্ঞা ও পরিধি ব্যাপক।

সংস্কৃতির কথা প্রবন্ধের মূল বক্তব্য, বিষয়বস্তু, মূলভাব

সংস্কৃতির কথা প্রবন্ধের মূল বক্তব্য মূলভাব বিষয়বস্তু

কারো কারো মতে জীবনকে প্রকাশের নামই সংস্কৃতি। আবার কেউ কেউ মনে করেন সংস্কৃতি হচ্ছে সভ্যতার নির্যাস। কারও মতে আবার সংস্কৃতি হচ্ছে প্রগতির পথ ধরে জীবনের পূর্ণতা লাভের একটি সচেতন কর্মপ্রয়াস। মোতাহের হােসেন চৌধুরীর মতে সংস্কৃতি মানে জীবনের মূল্যবােধ সম্পর্কে ধারণা। সংস্কৃতি মানুষকে সুন্দরভাবে, মহৎভাবে বাঁচতে শেখায়।  এককথায়, শিক্ষিত ও মার্জিত লোকের ধর্মই হলাে সংস্কৃতি। সংস্কৃতি মানুষের ভিতরে একটা নিজস্ব জীবনদর্শনের জন্ম দেয়।  মানুষ নিজেকে গড়ে তোলে শিক্ষাদীক্ষা ও সৌন্দর্য সাধনার সাহায্যে। মানুষকে বিশেষভাবে গড়ে তোলার কাজ হচ্ছে সংস্কৃতির। সংস্কৃতি মানুষকে বিচিত্রভাবে, মহৎভাবে, সুন্দরভাবে চেঁছে থাকতে শেখায়। প্রকৃতি ও মানব সংসারের মধ্যে অসংখ্য শিকড় প্রবেশ করিয়ে দিয়ে রস টেনে নিয়ে সংস্কৃতি মানুষকে বাঁচায়। প্রগতি, সভ্যতা ধর্মের চর্চার মাধ্যমে বিশ্বের বুকে বুক মিলিয়ে গভীরভাবে বাঁচার নাম সংস্কৃতি।

সংস্কৃতি মানুষকে উদার, কর্তব্যপরায়ণ ও প্রমিক করে তােলে। ধর্মে আর সংস্কৃতি এক নয়। ধর্ম সাধারণ লােকের সংস্কৃতি আর সংস্কৃতি মার্জিত ও শিক্ষিত লােকের ধর্ম। ধর্ম মানে জীবনের নিয়ন্ত্রণ। অন্যদিকে, সংস্কৃতি মানে উন্নততর জীবন সম্বন্ধে চেতনা, সৌন্দর্য, আনন্দ ও প্রেম সম্বন্ধে অবহিতি। সাধারণ মানুষ ধর্মের মাধ্যমেই তা পেয়ে থাকে। কিন্তু সংস্কৃতিবান মানুষ সংস্কৃতির মাধ্যমেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করে। বাইরের ধর্ম নয়, ভিতরের সূক্ষ্ম চেতনাই তাদের চালক। সংস্কারমুক্তি ও সংস্কৃতি এক জিনিস নয়। সংস্কারমুক্তি সংস্কৃতির একটি পূর্বশর্ত মাত্র। সংস্কৃতির অনিবার্য শর্ত হচ্ছে মূল্যবােধ। সংস্কারমুক্তি ছাড়াও সংস্কৃতি হতে পারে; কিন্তু মূল্যবােধ ছাড়া সংস্কৃতি হয় না। মূল্যবােধহীন সংস্কৃতির চেয়ে কুসংস্কারও ভালাে। সংস্কৃতির সাধনা মানে Ripe হওয়ার সাধনা। সেজন্য জ্ঞানের প্রয়ােজন আছে, বিজ্ঞানের প্রয়ােজন আছে; কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রয়ােজন প্রেমের। সংস্কৃতিবান হওয়া মানে প্রেমবান হওয়া ।

প্রেমের তাগিদে বিচিত্র জীবন ধারায় যে স্নাত হয়নি সেতো অসংস্কৃত। তার গায়ে যে প্রাকৃত জীবনের কটুগন্ধ লেগে রয়েছে তা অসহ্য। সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থ নীরে স্নাত না হলে সংস্কৃতিবান হওয়া যায় না। প্রগতি সংস্কৃতিরই উপকরণ। যে সমাজে সংস্কৃতিচর্চা নেই সেই সমাজে প্রগতির দ্বার রুদ্ধ। সংস্কৃতিচর্চার মধ্য দিয়েই প্রগতি বিকশিত হয়। সংস্কারমুক্তিও প্রগতির পূর্বশর্ত। অন্যদিকে, তা সংস্কারমুক্তির একটা শর্ত মাত্র । সাধারণ মানুষের কাছে প্রগতি আর সভ্যতার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। যা সভ্যতা তাই প্রগতি অথবা যা প্রগতি তা-ই সভ্যতা। সংস্কৃতি সমাজতান্ত্রিক নয়, ব্যক্তিতান্ত্রিক। নিজেকে বাঁচাও, নিজেকে মহৎ করাে, সুন্দর করাে, বিচিত্র করাে এটাই সংস্কৃতির নির্দেশ। এ আদেশের সফলতার দিকে নজর রেখেই তা সমাজতন্ত্রের সমর্থক। সমাজতন্ত্র সংস্কৃতির লক্ষ্য নয়, উপলক্ষ মাত্র। ‘সংস্কৃতি ব্যক্তিতান্ত্রিক’ এ কথা বললে এটা বুঝায় না যে, সংস্কৃতিবান মানুষ সমাজের ধার ধারে না- সে দল ছাড়া গোত্র ছাড়া জীব। সংস্কৃতিবান মানুষ সমাজের ধার খুবই ধারে। নইলে সে প্রাণ পাবে কোথা থেকে? ব্যক্তি তাে নদী, আর সমাজ হলাে সমুদ্র।

সমুদ্রের সাথে যােগযুক্ত না হলে সে বাঁচবে কিভাবে? সুতরাং নিজের স্বার্থের দিকে নজর রেখেই সংস্কৃতিবান মানুষ সমাজের কথা ভাবে। এমনকি প্রয়ােজন বােধে সমাজের জন্য সে প্রাণ পর্যন্ত দিতে পারে। সংস্কৃতিবান মানুষ ব্যক্তিতান্ত্রিক এই অর্থে যে, সমাজ বা অর্থনীতির কথা ভেবে সে নিজের অসৌন্দর্যকে ক্ষমা করে না। এ সমাজে এ অর্থনীতির অধীনে এর চেয়ে বেশি সুন্দর হওয়া যায় না, এ কথা বলে নিজেকে কি অপরকে সান্ত্বনা দিতে সে লজ্জা বােধ করে। সুতরাং সংস্কৃতিবান মানুষ সবসময়ই মূল্যবােধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সংক্ষেপে সুন্দর করে, কবিতার মতাে করে বলতে গেলে বলতে হয়- সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে, মহৎভাবে বাঁচা। প্রকৃতি সংসার ও মানব সংসারের মধ্যে অসংখ্য অনুভূতির শিকড় চালিয়ে দিয়ে বিচিত্র রস টেনে নিয়ে বাঁচা ! সংস্কৃতি মানে কাব্য পাঠের মারফতে ফুলের ফোটায়, নদীর ধাওয়ায়, চাদের চাওয়ায় বাঁচা।

সংস্কৃতি মানে আকাশের নীলিমায় তৃণগুলাের শ্যামলিমায় বাচা। বিরহীর নয় জলে ও মহতের জীবনদানে বাঁচা। সংস্কৃতির অর্থ গল্প কাহিনীর মারফতে ও নরনারীর বিচিত্র সুখ দুঃখে বাঁচা, ভ্রমণ কাহিনীর মারফতে, বিচিত্র দেশ ও বিচিত্র জাতির অন্তরঙ্গ সঙ্গী হয়ে বাঁচা। সংস্কৃতি মানে ইতিহাসের মারফতে মানসভ্যতার ক্রমবিকাশে বাঁচা; জীবনকাহিনীর মারফতে দুঃখীজনের দুঃখ নিবারণের অঙ্গীকারে বাঁচা। প্রচুরভাবে, গভীরভাবে বাঁচা! বিশ্বের বুকে বুকে বুক মিলিয়ে বিচিত্রভাবে বাঁচার নামই সংস্কৃতি। সংস্কৃতির অর্থ জীবনের Values সম্বন্ধে ধারণা। জীবনের মূল্যবোধকে আশ্রয় করেই সংস্কৃতি গড়ে উঠে। জীবনের বাইরে সংস্কৃতির কোন অবস্থান নেই। জীবনই সংস্কৃতি।

প্রশ্নঃ সংস্কৃতির কথা কার লেখা?

উত্তরঃ মোতাহের হোসেন চৌধুরীর লেখা সংস্কৃতি কথা প্রবন্ধে আধুনিক বুদ্ধিদীপ্ত ধারা প্রবন্ধ সাহিত্যের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি মোতাহের হােসেন চৌধুরী। যুক্তি ও চিন্তার শানিত প্রকাশে তার সৃষ্ট প্রবন্ধসমূহ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। সংস্কৃতি কথা’ মোতাহের হােসেন চৌধুরীর একটি অনবদ্য সৃষ্টি।

আরো পড়ুন: বাংলার জাগরণ প্রবন্ধের মূল বক্তব্য

সংস্কৃতির কথা প্রবন্ধের মূল বক্তব্য, মূলভাব, বিষয়বস্তু বুঝতে পেরেছেন। আরো কিছু জানার থাকলে নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারেন ধন্যবাদ।

 7v7 সাইট থেকে সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি।

Leave a Comment